পঞ্চান্নতম অধ্যায়: অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অভিনেতা
ক্যোতোর দ্রুতগতির ট্রেন টোকিওর পথে ছুটছে। উত্সুক চোখ বুজে আসনে হেলান দিয়ে বসে আছেন উদোকি কাই, জানালার পাশে তাঁর সঙ্গিনী, গৃহপরিচারিকা আয়ানামি ইউই। আয়ানামি আগে কখনো টোকিও আসেনি। আসলে, দু'দিন আগে শিগা প্রদেশের বিওয়া হ্রদে ঘুরতে যাওয়া ছিল তার জীবনে প্রথমবার ক্যোতোর বাইরে যাওয়া। ছোট্ট গৃহপরিচারিকাটি ক্যোতোর বাইরের সবকিছুতেই খুব কৌতূহলী, অনেকটা ঠিক যেমন প্রথমবার টোকিও থেকে ক্যোতো আসার সময় কাই নিজেও ছিল। এবার, কাই আন্তরিকভাবে জানালার পাশের আসনটি ছেড়ে দিয়েছে আয়ানামির জন্য; যেই দৃশ্য একবার দেখা হয়ে গেছে, আরেকবার দেখলে তেমন নতুনত্ব থাকে না।
কাই চুপিচুপি নিজের সিস্টেম খুলে দেখল—
নাম: উদোকি কাই
বেঁচে থাকার সময়: ২১৮৫ ঘণ্টা
পুণ্য অর্জন: ৭৭৩
প্রধান মিশন: মাছ ধরার সঙ্গী ৩/৩ (সম্পূর্ণ)
উপমিশন: দুইবার প্রেমে পড়া ১/২ (অসম্পূর্ণ)
পুণ্য অর্জন করতে থাকো, ভাগ্য একদিন ঠিকই ফিরবে।
শক্তি বাড়াতে ও মাছ ধরার দক্ষতা নিতে পুণ্য বিনিময় করে, এখন হাতে আছে মাত্র ৭৭৩ পয়েন্ট। ঘন্টা কমে প্রায় ২০০০-তে নেমে এসেছে দেখে, কাই অবশিষ্ট সব পুণ্য এতে যোগ করল। মাছ ধরার সঙ্গী মিশন শেষ হতেই ১৫০০ পয়েন্ট পুরস্কার এসেছে, সেটা সে আপাতত জমিয়ে রেখেছে ভবিষ্যতের জন্য। এখন আবার নতুন মিশন এসেছে, যা দেখে কাই-এর চোখ জ্বলে উঠল।
প্রধান মিশন: অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অভিনয়শিল্পী ০/৫ (অসম্পূর্ণ), সম্পন্ন হলে পুরস্কার ২০০০ পুণ্য।
কাইয়ের মনে পড়ে, তাদের কোম্পানিতে এমন পেশা তো আছেই! তাহলে তো সহজেই অফিসে ফিরে নিজের পেশা চালাতে পারবে। আগে ভাবছিল, কোম্পানিতে ফিরে পরিবারের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সাতো নোয়া-র সঙ্গে চুক্তি ভাঙার ব্যাপারে কথা বলবে। এখন দেখছে, আর দরকার নেই। এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অভিনেতার পেশা পূর্বজন্মের হুয়াশিয়া কিংবা এখনকার নিওন দেশ—দু’টোতেই খুব সাধারণ। সাধারণত এরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্য, কাঁদার সঙ্গী,代理 কবর দেওয়া ইত্যাদি কাজ করে। এমনও হয়, কেউ কেউ মৃতের স্বামী বা স্ত্রীর দেহ সাজিয়ে এক ঘণ্টা শুয়ে থাকে, যেন মৃতের সঙ্গী। এসব কাজের দামও বিভিন্ন। কাই শুধু চায় সহজ কোনো অর্ডার আসুক; কাঁদা বা代理 কবর দেওয়া হলে ভালো,孝子孝孙 সাজানোও চলবে, কিন্তু মৃত দেহের অভিনয়টা সে পারবে না।
নিওন দেশের আয়তন ছোট, টোকিওর ট্রেন ক্যোতো থেকে আরও দ্রুত চলে। মাত্র দুই ঘণ্টা পেরুতেই তারা টোকিও স্টেশনে পৌঁছে যায়।
প্রথমবার বড় শহরে আসা আয়ানামি ইউই এদিক-ওদিক তাকিয়ে বিস্ময়ে ভরে যায়। বিশেষ করে কাই যখন তাকে নিয়ে টোকিওর মেট্রো স্টেশনে ঢোকে, সে কৌতূহলী গলায় বলে ওঠে, ‘‘ওহ, মালিক, আমরা কি মেট্রো ধরব?’’ সে ভাবতেই পারেনি ক্যোতোর সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান টোকিওতে মেট্রো চড়ে! ভেবেছিল কোনো দামি গাড়ি আসবে তাকে নিতে।
কাই হেসে শান্ত গলায় জানায়, ‘‘শুনো, আমার জীবন সাধারণ মানুষের মতোই, বরং তাদের চেয়েও সাদামাটা। তোমার যদি মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়, আবেদন করতে পারো। আমি চাচাকে জানিয়ে দেব, তুমি ক্যোতো ফিরে যেতে পারো।’’
‘‘না, না, আমি ফিরব না!’’ আয়ানামি মাথা নাড়ে। ‘‘আমি ক্যোতো ফিরতে চাই না, মালিকের সেবায় থাকতে চাই।’’
সে গরিব ঘরে মানুষ, বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া মালিকের জীবন এত খারাপ তো হবে না। ক্যোতো ফিরে গেলে একা হয়ে যাবে, এখানে মালিক যেমন সুদর্শন, তেমনই মায়াবী—অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
দু’জনে যখন আকাসাকা-র অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে, তখন বিকেল পাঁচটা। কাই স্নান সেরে, ব্ল্যাক ক্যাট চাচার অভিমানী চোখের সামনে, সোফার উপর আয়ানামির বিছানা পেতে দেয়। পেট বাজছে, দেখে আয়ানামি সোফায় গুটিসুটি হয়ে টিভি দেখছে, ছোট ছোট পা ভাঁজ করে বসে, কোমল পায়ে গোলাপি আঙুলের সারি।
কাই এগিয়ে মাথায় আলতো চাপড় দেয়, ‘‘আমি ক্ষুধার্ত, যাও রান্না করো।’’
‘‘আচ্ছা মালিক!’’ আয়ানামি দৌড়ে রান্নাঘরে ঢোকে, ফ্রিজ খুলে দেখে কোনো সবজি নেই, বিরক্ত হয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে। ঘরে ঢুকেই সে মালিকের নির্দেশে বিছানা পেতে টিভি দেখতে বসেছিল, মাঝে মাঝে বিছানা দখল করে নেওয়া বিড়ালটিকে খুঁচিয়ে দিত। কখনও খেয়ালই করেনি ফ্রিজে কিছু আছে কি না—একজন গৃহপরিচারিকার এ ভুল করা ঠিক হয়নি।
ইউই, ইউই, এতো ছোট কাজও যদি ভুলে যাও, তবে তো একেবারেই অযোগ্য!
সে রান্নাঘরের চারপাশে আর কিছু আছে কিনা খোঁজে, কোথাও কোনো খাবার পায় না। শেষমেশ লাজুক কণ্ঠে বলে, ‘‘মালিক, মনে হয় কোনো সবজি নেই!’’
কাই নিজের কপালে হাত চাপড়ে স্মরণ করে—এটা ভুলে গিয়েছে! বের হওয়ার আগে সকালে সবজি না থাকায় স্রেফ সেদ্ধ নুডলস আর ডিম দিয়েছিল নিজের আর ছোট ইউকে। এখন বাজারে গেলে ফিরতে ফিরতে চল্লিশ মিনিট, খেতে বসতে দেড় ঘণ্টা হয়ে যাবে। নিজেকে খানিকটা গর্জে ওঠে।
তাহলে কি না, পাশের বাড়ি মাতসুএদা আয়াকার বাড়ি থেকে একটু চেয়ে আনা যায়? সেদিন ওখানে রান্না করতে গিয়ে দেখেছিল, অনেক কিছুই আছে। আয়াকার কথা মনে হতেই কাইয়ের মনে পড়ে, দু’দিন আগে বিওয়া হ্রদের বাড়িতে একটু বেশি মদ খেয়ে মাতসুএদা বাড়ির কর্তার কাছে কথা দিয়েছিল টোকিও ফিরে আয়াকা দিদির সঙ্গে ডেট-এ যাবে।
তবে কি, সত্যিই আয়াকা দিদিকে বিয়ে করতে হবে? তাকেগাই চাচা আর মাতসুএদা কর্তার মনে হয়, আমাদের দু’জনের সম্মতি থাকলেই পরিবার রাজি। এবং পরিবার যখন কথা দিয়েছে, তখন পিছু হটাও মুশকিল—এটা পরিবারের মান-সম্মানের প্রশ্ন।
‘‘একটু দাঁড়াও, আমি দেখি পাশের বাড়িতে কিছু আছে কিনা,’’ কাই আয়ানামিকে জানায়। তারপর উঠে দরজার দিকে যায়, মাঝপথে মনে পড়ে—এভাবে শুধু শর্টস আর সোয়েটশার্ট পরে যাওয়া ঠিক হবে না। আবার ঘরে গিয়ে প্যান্ট বদলায়...
হালকা সুগন্ধি মাখে...
চুল আঁচড়ে নেয়...
আয়নায় নিজেকে একবার দেখে, পোশাক ঠিকঠাক কিনা নিশ্চিত হয়। ঘর থেকে বেরোতেই দেখে আয়ানামি কৌতূহলী মুখ করে তাকিয়ে আছে।
মালিক কি তবে কী করতে যাবেন? রান্নার জন্য তো এমনভাবে সাজতে হয় না!
আয়ানামির প্রশ্নবিদ্ধ মুখ এড়িয়ে, কাই দরজা খুলে প্রায় সামনের ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়।
---
(পরবর্তী অধ্যায় শিগগির আসছে, আজ দুই ভাগে প্রকাশিত)